সমুদ্র অর্থনীতি কী?||ব্লু ইকোনমি কি ?what is blue economy||সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy) বা সমুদ্র অর্থনীতি কাকে বলে?||ব্লু ইকোনমি কি এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও অগ্রগতি

 সমুদ্র অর্থনীতি কী?||ব্লু ইকোনমি কি ?what is  blue economy||সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy) বা সমুদ্র অর্থনীতি কাকে বলে?||ব্লু ইকোনমি কি এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও অগ্রগতি

সমুদ্র অর্থনীতি :

গান্টার পাওলি "ব্লু ইকোনমি " বা সমুদ্র অর্থনীতি ধারণাটির জনক।

সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি (Blue Economy) হলো অর্থনীতির এমন একটি বিষয় যেখানে একটি দেশের সামুদ্রিক পরিবেশ কিংবা সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষন নিয়ে আলোচনা করা হয়। এই 'সুনীল অর্থনীতি' কিংবা 'ব্লু ইকোনমি' আরেক নাম 'সমুদ্র অর্থনীতি'।

সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রের সম্পদনির্ভর অর্থনীতি। 

সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের বিভিন্ন প্রকার সম্পদকে কাজে লাগানোর অর্থনীতি।

সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলতে যা বোঝায় সেটি হচ্ছে, সমুদ্রের রং নীল। আর সেকারণেই সমুদ্রকেন্দ্রীক যে অর্থনীতি তাকে সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি বলা হয়।

সমুদ্র অর্থনীতি খাত

  তবে বিশ্ব ব্যাংকের রিপোর্ট অনুযায়ী ব্লু ইকোনমির আধুনিক সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, সমুদ্রে যে পানি আছে এবং এর তলদেশে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে সেই সবধরনের সম্পদকে যদি আমরা টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করি তবে তাকে ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি বলে।

Blue economy is a term in economics relating to the exploitation, preservation and regeneration of the marine environment. Its scope of interpretation varies among organizations

ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনার ক্ষেত্রটা আসলে কতটুকু

২০১৪ সালে মিয়ানমারের কাছ থেকে আমরা সমুদ্র জয় করেছি। এতে আমাদের সমুদ্রসীমা বেড়েছে পুরো বাংলাদেশের সমান প্রায় আরেকটি অংশ। বাংলাদেশের বর্তমান সমুদ্র সীমার আয়তন ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার

যেহেতু আমাদের সমুদ্রসীমা অনেক বেড়েছে ফলে এই বিশাল পরিমাণ সমুদ্রকে আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি সেটাই মূখ্য বিষয় বা এই সমুদ্র থেকে আমরা কী কী সম্পদ পেতে পারি সেটা নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।

সমুদ্র পৃথিবীর অন্যতম মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। সমুদ্র, মাছ এবং মত্স্য সম্পদের মাধ্যমে খাবার চাহিদা মেটায়, মানুষ এবং পন্য পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়। এছাড়াও সমুদ্র নানা ধরনের প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ যেমন বালি, লবণ, কবাল্ট, গ্রাভেল, এবং কপার ইত্যাদির আধার হিসেবে ব্যবহূত হয় এবং তেল ও গ্যাস আহরণ ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্র প্রয়োজন হয়। এসব উপাদান সমষ্টিকেই বলা হয় সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy)| সুনীল অর্থনীতির এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করা, দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা, সামাজিক পুঁজির সৃষ্টি করা, আয় বাড়ানো এবং সর্বোপরি পরিবেশে সঞ্চয়-বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য সৃষ্টি করা।

সমুদ্রের অফুরন্ত সম্ভাবনার মধ্যে মাছের বাইরে রয়েছে, জৈবপ্রযুক্তি বা বায়োটেকনোলজি, তেল-গ্যাস, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজভাঙা শিল্প, সামুদ্রিক জলজ প্রাণীর চাষাবাদ, লবণ উৎপাদন, সমুদ্র পর্যটন। শিপিং শিল্পের কথা না বললেই নয়। জাহাজ নির্মাণ আমরা শুরু করেছি। তবে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কারণে জাহাজভাঙা শিল্পটি আপাতত বন্ধ আছে। আগে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে জাহাজ আসত আমাদের এখানে। সেগুলো ভাঙার কাজ করা হতো। কিন্তু আমাদের পরিবেশবিদরা বলছেন এই পুরনো জাহাজভাঙার ফলে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সমুদ্রের পানি নষ্ট হচ্ছে। যে কারণে জাহজ ভাঙার পরিবর্তে এখন নতুন নতুন জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি খুব লাভজনক একটি শিল্প।

বঙ্গোপসাগরে ভারতের হাতে থাকা ১০ টি গ্যাস ব্লকের মধ্যে ৮ টি এবং মিয়ানমারের ১৮টির মধ্যে ১৩ টির মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ। এসব ব্লক থেকে প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট(টিসিএফ) গ্যাস পাওয়া সম্ভব। তেল-গ্যাস ছাড়াও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে আছে রুটাইল, ইলমেনাইট, গার্নেট, মোনাজাইট, ম্যাগনেটাইট, কায়ানাইট, লিউকক্সিন ও জিরকনসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থ রয়েছে।


১০ পয়েন্টে বাংলাদেশের ব্লু ইকোনমি সম্ভাবনাঃ

‘ব্লু ইকোনমি’ সময়ের আলোচিত বিষয়। ২০৪১ এর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে সমুদ্রে পাওয়া ১,১৮,৮১৩ বর্গ কি. মি. এর যথাযথ ব্যবহারে সামুদ্রিক অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে ট্রামকার্ড।


(১) কিছুদিন আগে গৃহীত হয়েছে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০। এ মহাপরিকল্পনায় সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ৫ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমে সরকার সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রথম এবং প্রধান কাজটিই হাতে নিয়েছে।

২) সমুদ্র বিজয়ের ফলে বাংলাদেশ যে অঞ্চলের মালিকানা পেয়েছে, সেখানে অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চালানো হলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ কোটি মার্কিন ডলার উপার্জন করা সম্ভব। ক্ষেত্র চারটি হলো তেল-গ্যাস উত্তোলন, মৎস্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন।

(৩) সুস্থির সামুদ্রিক কার্যক্রমের নিমিত্তে বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক ব্লু প্রোগ্রামের ( PROBLUE) জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠন করা হয়েছে। যার সাইনিং সম্পাদিত হয়েছে নভেম্বর ২০১৮ তে। বাংলাদেশে সামুদ্রিক খাতেও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে।

(৪) বঙ্গোপসাগর তীরে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাই উপকূলে ১৪৫ কোটি মানুষের বাস। বাংলাদেশের অবস্থান কেন্দ্রে। ফলে এখানকার বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার ভালো সুযোগ রয়েছে।

(৫) বর্তমানে বাংলাদেশের ট্রলারগুলো উপকূল থেকে ৩৫-৪০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে মাছ আহরণ করে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০০ নটিক্যাল মাইল। আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করে সমুদ্র অর্থনীতিতে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।

(৬) জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ( FAO) মতে, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। নতুন জলসীমার অধিকার পাওয়ায় ব্লু ইকোনমি প্রসারে বাংলাদেশের এ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সমুদ্র খাতের এ সুযোগ লুপে নেয়াই এখন কাজ।

৭) ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি সদস্য দেশের সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান ওসেন রিম অ্যাসোসিয়েশন-IORA’ এর সদস্য বাংলাদেশ। ব্লু ইকোনমি নিয়ে এ জোটের বিভিন্ন দেশ কাজ করছে।

(৮) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (DCCI) হিসাব মতে, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ আসে সমুদ্রে মাছ আহরণ, সামুদ্রিক খাদ্য ও বাণিজ্যিক সমুদ্র পরিবহন হতে। প্রায় ৩ কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল সামুদ্রিক মাছ আহরণে নিয়োজিত আছে ৫০ লাখ মানুষ। এ খাতে আধুনিকায়ন হলে এ সংখ্যা বাড়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

(৯) সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল ‘ক্লে’র সন্ধান পাওয়া গেছে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে । অগভীর সমুদ্রের ক্লে উত্তোলন করা যায় গেলে বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এছাড়াও সমুদ্র তলদেশে মহামূল্যবান ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিশ্বে এ ধাতু দুটির চাহিদা কিরূপ তা সহজে অনুমেয়।

(১০) সমুদ্র নির্ভর অর্থনীতি থেকে যদি ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়, তাহলে ভিশন ২০৪১ পূর্ণ করা সহজ হবে। ফলে আমরা এই সময়ের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাব।

Blue Economics



*পর্যাপ্ত নীতিমালার ও সঠিক কর্ম পরিকল্পনার অভাব

★ দক্ষ জনশক্তির অভাব

★ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব

★ সম্পদের পরিমাণ ও মূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব

★ মেরিটাইম রিসার্চ ভিত্তিক পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়া

★ ব্লু ইকোনমি সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অভাব

★ সমুদ্র গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য গবেষণা জাহাজ না থাকা

তবে আমরা আসলে সুনীল অর্থনীতির একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি। আমাদের এই মুহূর্তে দরকার এ বিষয়ে একটি সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা। কিভাবে আমরা ব্লু ইকোনমিকে এগিয়ে নিতে পারব সে ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণা করা। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে প্রতিবেশীসহ অন্যান্য দেশ যারা ব্লু ইকোনমিতে এগিয়ে আছে তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে বিষয়টি ভালোভাবে জেনে নেয়া। আমরা কিভাবে এগোতে পারি সে ব্যাপারে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা ও সর্বোচ্চ সহযোগিতা নেয়া উচিত। আর সেদিক থেকে  মনে হয়  ব্লু ইকোনমি নিয়ে ‘আইওরা’ যে সম্মেলনটি হয়েছে ঢাকায় সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

span style="background-color: white; color: red; font-size: medium;">আরো পড়ুন..... 



Comments

Popular posts from this blog

রাষ্ট্র বিজ্ঞান কাকে বলে? || রাষ্ট্র বিজ্ঞান কী? || রাষ্ট্র বিজ্ঞানের বলতে কি বুঝায়? || রাষ্ট্র বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দাও? (What is Political Science?)

চাঁদ শব্দের প্রতিশব্দ/ সমার্থক শব্দ কিকি?

GDP ও GNP কাকে বলে? || GDP ও GNP এর মধ্যে পার্থক্য কি?