চাহিদা বৃদ্ধি জনিত ও ব্যয় বৃদ্ধি জনিত মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে পার্থক্য কি ? || (What is the Difference between Demand pull and Cost push Inflation)?
চাহিদ বৃদ্ধিজনিত এবং ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির পার্থক্য(Difference between Demand pull and Cost push Inflation) :
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি কেন ঘটে তার ব্যাখা হিসেবে সচরাচর ব্যয় বৃদ্ধিজনিত এবং চাহিদ বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির কথা বলা হয় ।
নিম্নে এ দুই প্রকার মুদ্রাস্ফীতির মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা হলাে -
১।সংজ্ঞাগত পার্থক্য:
সামগ্রিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে যে মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয় তাকে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাফীতি বলা হয় ।
পক্ষান্তরে , উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে যে মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয় তাকে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি বলা হয় ।
২ । পূর্ণ নিয়ােগঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ােগ বলতে এমন অবস্থাকে বুঝানাে হয় যখন চাহিদার প্রেক্ষিতে দ্রব্যের যােগান পুরােপুরি অস্থিতিস্থাপক হয় ।
পক্ষান্তরে ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ােগ বলতে এমন অবস্থাকে বুঝানাে হয় যখন চলতি নিয়ােগ এর স্বাভাবিক স্তরের নিচে থাকে অথবা বেকার শ্রমিকদের মধ্যে নিয়োগ পেতে চাওয়া শ্রমিকদের সংখ্যা নিয়ােগযোগ্য পদ সংখ্যার সমান থাকে ।
৩ । মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হওয়ার কারনঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হওয়ার কারণ হিসেবে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি , অর্থের যােগান বৃদ্ধি , বেসরকারি ভােগ ও বিনিয়ােগ বৃদ্ধি , কর হার হ্রাস , সুদের হার হ্রাস ইত্যাদিকে চিহ্নিত করা হয় । পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির কারণ হিসেবে ট্রেড ইউনিয়ন কর্তৃক অধিক মজুরী আদায় এবং একচেটিয়া বা ওলিগােপলি শিল্প পণের অধিক মূল্য আদায়ের লক্ষ্যে উৎপাদনে পরিমান হ্রাস করাকে চিহ্নিত করা হয় ।
৪ ।ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যাশাঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা দ্বারা ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় বেশি প্রভাবিত হয় । কারণ ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যাশা ধনাত্মক হলে মানুষ চলতি সময়ে বেশি পরিমান দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করে যা চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতিকে তীব্র করে । পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে মজুরী বৃদ্ধির প্রত্যাশা বুব বেশি জোরালো হয় না । কারণ তা নির্ভর করে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নের উপর যা অনেক দেশেই নেই ।
৫ ।ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাব :
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন তেমন কোন প্রভাব বিস্তার করতে পারে না ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়নের একচেটিয়া কার্যক্রম মারাত্মকভাবে প্রভাব বিস্তার করে ।
৬ ।জাতীয় আয় :
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারসাম্য জাতীয় আয় বৃদ্ধি পায় । পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্তর বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারসাম্য জাতীয় আয় হ্রাস পায় ।
৭।বাজার ভিত্তিক পার্থক্যঃ
ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি দ্রব্য বাজারে মনােপলি , ওলিগােপলি এবং শ্রম বাজারে শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নের প্রভাবের ফলে সৃষ্টি হয় ।
পক্ষান্তরে , চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে এ ধরণের প্রভাব খুব একটা নেই । মূলত দ্রব্য বাজারে চলতি মূল্যে অতিরিক্ত চাহিদার জন্য এই মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি হয় ।
৮ ।সামগ্রিক চাহিদা ও যােগান রেখার স্থানান্তরঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে সামগ্রিক চাহিদা রেখা ডানদিকে স্থান পরিবর্তন করে । এক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ােগ স্তরে সামগ্রিক যােগান রেখা স্থির থাকে ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে সামগ্রিক চাহিদা রেখা প্রদত্ত অবস্থায় সামগ্রিক যোগান রেখা বামদিকে স্থান পরিবর্তন করে ।
৯ । বাহ্যিক উপাদানের প্রভাবঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি বাহ্যিক উপাদান দ্বারা কম প্রভাবিত হয় ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি বৰ্হিবিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা প্রভাবিত হয় যেমন , তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল অবস্থা ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতিতে ভূমিকা রাখে ।
১০ ।মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আর্থিক ও রাজস্ব নীতিকে ব্যবহার করা যায় ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মজুরী সীমা নির্ধারণ , একচেটিয়া ও ওলিগোপলি । ফার্মের উপর বিধিনিষেধ আরােপ ইত্যাদি বিশেষ ভূমিকা পালন করে ।
১১ । সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা নির্দেশঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতির সমৃদ্ধি অবস্থাকে প্রকাশ করে ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ফলে উৎপাদন হ্রাস পায় ও বেকারত্ব বৃদ্ধি পায় যা অর্থনীতির মন্দা অবস্থাকে নির্দেশ করে ।
১২ ।মূল্যস্তর ও উৎপাদনঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্তর ও উৎপাদন একই সাথে বৃদ্ধি পায়।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির ক্ষেত্রে মূল্যস্তর বৃদ্ধি পায় কিন্তু উৎপাদন হ্রাস পায় । ।
১৩। সময়কালঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতি স্বল্পমেয়াদী কিংবা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে ।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির স্থায়িত্ব স্বল্পমেয়াদী । তবে এ মুদ্রাস্ফীতির পিছনে চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির সমর্থন থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে।
১৪ । গতিময়তাঃ
চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির গতিবেগ ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় বেশি থাকে।
পক্ষান্তরে , ব্যয় বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির গতিবেগ চাহিদা বৃদ্ধিজনিত মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম থাকে ।
আর ও পড়ুন...
আর ও পড়ুন...
Comments
Post a Comment